আজও মনে পড়ে তার কথা- জানিনা আবার কখনোও কি হবে দেখা?
ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি যাত্রার শেষ বাসটি যখন মানিকনগর কাউন্টার ছেড়েছিল, তখন রাতের অন্ধকার কেবল গাঢ় হতে শুরু করেছে। ২৭ আগস্ট ২০২৬-এর সেই ভেজা রাতটি আমার জীবনের একটি সাধারণ ভ্রমণ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু একটি আকস্মিক পরিচয়ে সেই যাত্রা পরিণত হয়েছিল এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা আর মানবিক স্মৃতির অভিজ্ঞতায়।
আমি খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের মাস্টার্স শেষ বর্ষের ছাত্র। সাপ্তাহিক ছুটি আর কয়েক দিনের পড়াশোনার বিরতি শেষে বাড়ি ফিরছিলাম। বাসের টিকিটটি ছিল ‘C3’ সিটে। বাসটিতে উঠে সিটের দিকে এগোতেই দেখি, আমার পাশের অর্থাৎ ‘C4’ সিটে বসে আছে এক কিশোরী। পরনে সাধারণ পোশাক, চোখে ক্লান্তি আর একরাশ অস্বস্তি। রাতের জার্নিতে কোনো অজানা মেয়ের পাশে বসতে আমার কিছুটা জড়সড় বোধ হচ্ছিল। তাছাড়া কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে বাস সুপারভাইজারকে ডেকে অনুরোধ করলাম সিটটা বদলে কোনো পুরুষ যাত্রীর পাশে দেওয়ার জন্য। সুপারভাইজার সোজা জানিয়ে দিলেন, বাস ফুল—সিট পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
![]() |
| বাস জার্নির গল্প |
অগত্যা কোনো উপায় না দেখে আমি সিটের পাশে দাঁড়িয়েই রইলাম। কিছুক্ষণ পর কিশোরীটি নিজেই বলল, "আপনার যদি কোনো সমস্যা না থাকে, তবে আপনি সিটে বসতে পারেন। আমার কোনো অসুবিধা নেই।"
কথাগুলোর মাঝে একধরনের সরলতা আর অমায়িকতা ছিল। আমি অনাবিল সংকোচ নিয়ে সিটের এক কোণে কোনোমতে গা বাঁচিয়ে বসলাম। রাত যত বাড়ছিল, বাসের ইঞ্জিনের গর্জন আর রাতের আঁধার তত ঘন হচ্ছিল। নীরবতা ভাঙতে সেই মেয়েটিই আগ বাড়িয়ে জানতে চাইল, "আপনি কোথায় যাবেন?"
"খাগড়াছড়ি," সংক্ষেপে উত্তর দিলাম।
"আমিও খাগড়াছড়ি যাব," সে বলল। এরপর আমার পরিচয়, পড়াশোনা ও গন্তব্য নিয়ে টুকটাক প্রশ্ন করতে লাগল। আমি জানালাম, আমার বাড়ি ঢাকার মতিঝিলে, তবে পড়াশোনার খাতিরে খাগড়াছড়ি থাকা হয়। আমার পরিচয় গোপন রাখার জন্য আমার বাসা ও পড়াশোনার ঠিকানাটি উল্টিয়ে উত্তর দিলাম। মেয়েটির মনে কৌতূহল ছিল—ঢাকায় এত ভালো ভালো কলেজ থাকতে পাহাড়ি অঞ্চলের এক সরকারি কলেজে কেন মাস্টার্স করতে গেলাম! আমি হেসে এড়িয়ে গেলাম।
এরপর ওর গল্প শুনলাম। সে আব্দুল্লাহপুরের একটি স্কুলে দশম শ্রেণীতে পড়ে। নাম নুসরাত আমেনা মুক্তা। খাগড়াছড়ির শালবাগান মসজিদের বিপরীত পাশে ওর দাদুর বাসা। রাতে কোচিং শেষ করেই ও খবর পায় যে দাদু ভীষণ অসুস্থ। দিনেও কিছু খাওয়া হয়নি, সন্ধ্যার পর তাড়াহুড়ো করে আব্দুল্লাহপুর থেকেই বাসে চেপে বসেছে একমাত্র দাদুকে দেখার ব্যাকুলতা নিয়ে। একা একটা কিশোরী মেয়ে রাতের বাসে চড়ে এতটা পথ যাচ্ছে কেবল ভালোবাসার টানে—শুনে মনটা এক অদ্ভুত শ্রদ্ধায় ভরে উঠল। আমার নিজের ছোট বোন দুটোর কথা মনে পড়ে গেল। অদ্ভুতভাবে, ‘নুসরাত’ আর ‘আমেনা’—এই দুটি নামেই আমার দুই ছোট বোনের নাম রয়েছে। দেখতেও ও আমার খালাতো বোন মুক্তার মতো মায়াবী ও নিষ্পাপ। মনে মনে ভাবলাম, একটা মুক্তো যেমন ঝিনুকের আবরণে সুরক্ষিত থাকে, এই মেয়েটিও যেন তেমনি তার পরিবারের এক অমূল্য রত্ন।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে লাগল। সারা দিনের ক্লান্তি আর খিদের কারণে বাসের ঝাঁকুনিতে ও অসুস্থ হয়ে পড়ল। লজ্জায় মুখ নিচু করে বলল, "ভাইয়া, আমার বাসে বমি করার অভ্যাস আছে। আজ শরীরটা আরও বেশি খারাপ। আপনার কি কোনো সমস্যা হবে?"
আমি মুখে মাস্ক পরা অবস্থাতেই বললাম, "না, একদমই না। তুমি ব্যস্ত হয়ো না।"
পরক্ষণেই শুরু হলো ওর অসুস্থতা। মেয়েটি একটার পর একটা বমি করতে লাগল। কোনো সাহায্যকারী পাশে নেই, ও একা। নিজের ছোট বোনের মতো মেয়েটার কষ্ট দেখে স্থির থাকতে পারলাম না। সুপারভাইজারকে ডেকে পর পর চারটে পলিথিন আনিয়ে দিলাম, পানির বোতল এগিয়ে দিলাম। ও নিঃসংকোচে বড় ভাইয়ের মতো আমাকে ভরসা করতে শুরু করল। সেবা আর আশ্বাসে একসময় ও একটু শান্ত হলো। শারীরিক দুর্বলতায় একপর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়ে ও আমার কাঁধেই মাথা ঢেলে দিল।
আমার ভয় হচ্ছিল ওকে জাগিয়ে দিলে আবার অসুস্থ বোধ করবে কি না। তাই চুপচাপ বসে রইলাম। রাতের অন্ধকারে বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়িগুলোর হেডলাইটের আলো যখন জানালার কাচ গলে ওর মুখে এসে পড়ছিল, আমি দেখছিলাম এক নিষ্পাপ, শ্রান্ত কিশোরী বোনের কোমল চেহারা। যেন নিজের কোনো ছোট বোন ভ্রমণের কষ্টে ক্লান্ত হয়ে বড় ভাইয়ের কাঁধে নির্ভরতা খুঁজে নিয়েছে।
কুমিল্লা মিয়ামি হোটেলে বাস যখন যাত্রাবিরতি দিল, ওকে ঢেকে দিলাম ক্ষুধার যন্ত্রনায় সারারাত বমি করেছে তাই ফ্রেশ হয়ে হোটেল থেকে কিছু খেয়ে নেওয়ার জন্য। কিন্তু মুক্তা কিছুই খায়নি শুধুমাত্র ফ্রেশ হয়ে এসে দুটি আইস্ক্রিম নিলো বার থেকে। ছোট বোনের দৃষ্টিকোণ থেকে আইস্ক্রিমের বিলটা আমিই দিয়ে দিলাম। এরপর আবার যাত্রা শুরু হলো। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ আর সকালের আলো ফোটার মধ্যবর্তী সময়ে আমাদের বেশ কিছু গল্প হলো। ও বলল, দাদুর প্রতি ওর টানের কথা, স্কুলের বন্ধুদের কথা। একটা ছোট্ট মেয়ের মনে কতটা মায়া আর দায়িত্ববোধ থাকলে একা এভাবে ছুটে আসতে পারে, তা ভেবে অবাক হচ্ছিলাম।
সকালে বাস যখন খাগড়াছড়ির শাপলা চত্বরে পৌঁছাল, মুক্তা নামার প্রস্তুতি নিল। নামার আগে ও খুব আগ্রহ নিয়ে আমার ফোন নম্বর চাইল, যোগাযোগ রাখার জন্য। কিন্তু আমি পরম মমতায় তা এড়িয়ে গেলাম। আমার নিজস্ব সংসার আছে, ব্যক্তিগত ব্যস্ততা ও দায়বদ্ধতা আছে। একজন সাধারণ পথচলতি শুভাকাঙ্ক্ষী বা ভাইয়ের মতো এই স্মৃতিটুকু সুন্দর হয়ে থাক, এটাই চেয়েছিলাম। ও আমার নাম জিজ্ঞেস করলে আমি রাজিব হাসান ছদ্মনামে নিজের পরিচয় দিয়ে হেসে বলেছিলাম, "পৃথিবীটা খুব ছোট, কখনো যদি আবার স্বাভাবিক কোনো পরিস্থিতিতে দেখা হয়, তবে সেদিন নম্বর দেওয়া যাবে।"
ও হাসিমুখে গাড়ি থেকে নেমে গেল। দেখতে দেখতে খাগড়াছড়ির ভোরের কুয়াশায় মিলিয়ে গেল মেয়েটি।
আজও যখন বাসে কোনো দীর্ঘ রাতের ভ্রমণ করি কিংবা খাগড়াছড়ির পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে বাস এগোয়, ২৭ আগস্টের সেই রাতের কথা মনে পড়ে যায়। মনে হয়, অসুস্থ দাদুর কাছে পৌঁছাতে পারা সেই কিশোরী বোনটি হয়তো এখন ভালো আছে, তার দাদুকে নিয়ে সুস্থ-সুন্দর জীবন কাটাচ্ছে। এক রাতের সেই অকৃত্রিম স্নেহ, একটুখানি সহানুভূতি আর নিখাদ বড় ভাইয়ের মতো পাশে থাকার স্মৃতিটুকু আজও আমার মনে এক টুকরো স্নিগ্ধ আলোর মতো উজ্জ্বল হয়ে আছে।
-রাজিব হাসান
